পৃথিবীর সবথেকে বড় মাকড়শা

এরা হচ্ছে দক্ষিন আমেরিকায় বসবাস করা পৃথিবীর সবথেকে বড় মাকড়শা, যাদেরকে ইংরেজিতে বলা হয় Goliath Birdeater বা Theraphosa blondi সংক্ষেপে T. blondi চোখে দেখা যায় না, এমন প্রাণী যেমন আছে তেমনি রয়েছে বিশালাকায় হাতি। আবার কখনো দেখা যায় একই প্রজাতির মধ্যে কেউ বামন, আবার কেউ দীর্ঘকায়। মাকড়শাদের মধ্যেও এর বেতিক্রম নেই। টারান্টুলা মাকড়শাকে সাধারনত সব থেকে বড় প্রজাতির মাকড়শা বলে ধরা হয়। আকারের দিক থেকে, বিশেষ করে পায়ের আকারের কারণে মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির অনেক বড় বড় মাকড়শা দেখা যায়।

তবে আকার ও ওজনে সব থেকে বড় মাকড়শা হচ্ছে  দক্ষিণ আমেরিকার Theraphosa blondi বা T. blondi এদের ওজন ৭ আউন্স বা ১৭০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। আকৃতিতে এরা মানুষের হাতের তালু থেকেও বড় হয়। আঠারশো শতকে কয়েকজন পর্যবেক্ষক দেখতে পান যে Theraphosa গণের মাকড়শা পাখি (হামিং বার্ড) পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। তখন থেকে Theraphosa গণের মাকড়শাদের বলা হতো ‘পাখি খেকো’। এই নাম থাকা সত্ত্বেও T. blondi প্রজাতির মাকড়শাকে কিন্তু খুব একটা পাখি শিকার করতে দেখা যায় নি। T. blondi প্রজাতির মাকড়শা সাধারণত আরথ্রোপোডা পর্বের প্রাণী বেশি শিকার করে থাকে।

এই প্রজাতির মাকড়শা সাধারণত ভালো শিকারি এবং শিকার হিসেবে এরা যদি ছোট ইঁদুর বা গিরগিটি পেয়ে থাকে, তবে তাদেরকেও নিজেদের শিকারে পরিণত করে। তবে এদের শিকার ধরার কৌশল কিছুটা ভিন্ন। এরা অন্যান্য মাকড়শার মতো জাল বুনে শিকার করে না। এরা সরাসরি শিকারকে আক্রমণ করে। শিকার করতে এরা এদের পা গুলোকে ব্যাবহার করে। তবে সবথেকে কার্যকরভাবে ব্যাবহার করে এদের মুখের সামনের দু’টি লম্বা সূচালো দাঁত। blondi প্রজাতির মাকড়শা এই দাঁত দিয়ে এদের শিকারের শরীরে বিষ প্রবেশ করিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে এদের শিকার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এদের বিষ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়।

এমনকি এদের কামড়ের কারণে ডাক্তারেরে নিকট চিকিৎসা নেয়ারও প্রয়োজন নেই। T. blondi মাকড়শা শক্ত খাবার খেতে পারে না। ইঁদুর বা গিরগিটি শিকার করলেও এরা এদের খাদ্যকে তরলীকৃত করে হজম করে। অন্যান্য মাকড়শার মতো জাল বুনে বাসা তৈরি করে না T. blondi এরা জঙ্গলে মাটির উপর ঘাস, লতাপাতার ভিতরে বাসা বানিয়ে থাকে। তবে এই বাসা মজবুত করতে এরা শক্ত সিল্কের জাল ব্যাবহার করে। এদের পা চুলের মতো আবরণে ঢাকা থাকে। যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। গুস্তাভ হরমিগা এ সম্পর্কে বলেন, এদের পায়ের পশমগুলোকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে দেখলে অনেকটা হারপুনের মতো দেখতে মনে হয়। যার মাথা এদের দেহের সাথে আটকে থাকে। আক্রমণের শিকার হলে T. blondi এদের সামনের দুই পা উঁচু করে রক্ষণাত্মক ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকে।

স্ত্রী T. blondi একবারে ৫০ থেকে ১৫০ টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। ডিমগুলো একটি বড় ঝিল্লী দিয়ে আবৃত থাকে। যা ডিমগুলোকে সুরক্ষা দেয়। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর ২ থেকে ৩ বছর সময় লেগে যায় এদের পরিণত হতে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত মায়ের সাথেই এদের জীবন কাটে। স্ত্রী T. blondi প্রায় ২০ বছর বেঁচে থাকলেও পুরুষ T. blondi মাত্র ৩ থেকে ৬ বছর বেঁচে থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার অনেক অঞ্চলেই T. blondi কে সুস্বাদু খাবার হিসেবে খাওয়া হয়। এদের স্বাদ নাকি অনেকটা চিংড়ি মাছের মতো।

লিখেছেনঃ মাহবুব রেজওয়ান

তথ্য সূত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

ভয়ঙ্কর সেই লেকনেটরন রহস্য

অনেকের ধারনা, এই লেকের পানির ছোঁয়ায় সব পশুপাখি পাথর হয়ে যায়। লেক তো নয়, যেন রূপকথার দৈত্য। যে দৈত্যের স্পর্স পেলেই যেকোন প্রাণী পাথরে পরিনত হয়। আলোকচিত্রি রিক ব্র্যান্ডটের ক্যামেরায় পাথরের ফ্লামিঙ্গ,ঈগল,বাদুড়সহ আরও অনেক কিছুই ধরা পড়েছে যা দেখে অনেকের উৎসাহ আরো বেড়ে গিয়েছে।

আসলেই বাস্তবে কি ঘটে এই লেকে সেটা অনেকেরই অজানা। আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত তাঞ্জানিয়ার পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এলাকার একটি লেক হচ্ছে এই লেকনেটরন। মূলত এই লেকটির পানি এতটাই লবণাক্ত যে কিছু কিছু সংবেদনশীল প্রাণীর উপর এর চরম প্রভাব দেখা যায়। ছোট আকারের কিছু প্রাণীর ত্বক ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে এই লেকের লবণাক্ত পানি। লেকটির পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে লেকটির পানি অত্যন্ত ক্ষারীয়।

এর pH এর পরিমাণ ৯.৫ থেকে ১০.৫ পর্যন্ত হয়ে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে এর থেকেও বেশি হয়। এতো বেশি লবনাক্ততার উৎস মূলত সোডিয়াম কার্বনেট এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ। যা লেকের পানিতে আসে লেকটিকে বেষ্টন করে রাখা পাহাড়গুলো থেকে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে সোডিয়াম কার্বনেট জমা হওয়ার ফলে লেকটি হয়ে উঠেছে সোডিয়াম কার্বনেট ও অন্যান্য খনিজের এক মহা ভাণ্ডার।

সোডিয়াম কার্বনেট এমন একটি খনিজ যা কিনা প্রাচীন মিসরীয় মমি তৈরির অন্যতম একটি উপাদান হিসেবে ব্যাবহার করা হত। আর এই কারণেই যখন এই লেক বা তার আশেপাশের এলাকায় কোন পাখি বা অন্যান্য প্রাণী মারা যায়, তখন তা এই খনিজের প্রভাবে অনেকটা অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে বছরের পর বছর ধরে। তাছাড়া, নেটরন লেকটি বড় কোন নদী বা সাগরের সাথে মিলিত না হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে এর লবনাক্ততা অপরিবর্তিত রয়েছে। নেটরন লেকের লবনাক্ততা সত্ত্বেও লেকটি বাস্তুতন্ত্রের চমৎকার একটি উদাহরণ। প্রধানত ফ্লামিঙ্গ পাখিদেরই আধিক্য দেখা যায় লেকটিতে।

তাছাড়াও অনেক প্রজাতির পাখি ও বাদুড় রয়েছে লেকটিকে বেষ্টন করে রাখা পাহাড়গুলোতে। পাখিগুলো যখন তাদের জীবন পথের যাত্রা শেষ করে ফেলে, তখন অনেক সময় পাহাড় থেকে গড়িয়ে লেকের পানিতে গিয়ে জমা হয়। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ার সময় এদের মৃতদেহের গায়ে অনেক কাদামাটি জমা হয়। সেই সাথে লেকের পানি ও লবনাক্ততাও মিশ্রিত হয়। লেকের পাড়ে দিনের পর দিন থেকে শুকিয়ে যাবার পর এদের দেখলে মনে হয় রূপকথার জগত থেকে আগত পাথরের কোন মূর্তি। অথবা মনে হয় কোন শিল্পী পরম মমতায় এদের খোঁদাই করেছে পাথর কেটে।

লিখেছেনঃ শাহরিয়ার।

আশ্চর্য প্রাণী সূর্যমুখী তারামাছ

স্টারফিস বা তারামাছ নামে পরিচিত এই প্রাণীটি আসলে মাছ নয়। এটি কাঁটাওলা চামড়া গোত্রীয় একপ্রকারের সামুদ্রিক প্রাণী। সাগরে অসংখ্য প্রাণী বাস করে যাদের একটি বৃহৎ অংশের কোন খবরাখবর আমরা জানিনা। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, মাত্র ১০ ভাগ সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছে। এই বৈচিত্র্যময় প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম একটি প্রাণী হচ্ছে এই স্টারফিস বা তারামাছ।

প্রায় ১৫০০ প্রজাতির তারামাছের বসবাস সাগর মহাসাগরগুলোতে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম সানফ্লাওয়ার সী স্টার, বাংলায় বলা হয় সূর্যমুখী তারা মাছ। উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের অধিবাসী এই অমেরুদণ্ডী প্রাণীটির এক একটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিটার হয়ে থাকে। এদের এই বাহুগুলোর নিচে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহু। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এদের এই বাহুগুলো একটি সময় একা একাই তাদের শরীর থেকে খুলে আলাদা হয়ে যায়।

আলাদা হয়ে যাওয়া মানেই সেই বাহুগুলো যে মৃত তা নয়। কিছুদিনের মধ্যেই সেই আলাদা হয়ে যাওয়া বাহুর ছিড়ে যাওয়া অংশটি থেকে বেরিয়ে আসে আরো চারটি নতুন ছোট বাহু। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো বড় হয়ে যায় এবং তখন এরা আবারও একটি পুর্নাঙ্গ সানফ্লাওয়ার স্টার ফিসে পরিনত হয়। আলাস্কা এবং দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াতেও এদের দেখা মেলে। অবাক করা তথ্য হল একটি প্রাপ্তবয়স্ক তারা মাছের ১৬ থেকে ২৪টি বাহু থাকে, তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক সূর্যমুখী তারা মাছের শরীরে মাত্র পাঁচটি বাহু থাকে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাহুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে এবং একটি সময়ে গিয়ে সেগুলো মূল শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরা সাধারণত উজ্জ্বল কমলা, হলুদ, লাল কিংবা বাদামি রঙের হয়ে থাকে। সূর্যমূখী তারা মাছ দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং দক্ষ শিকারি। এরা সামুদ্রিক শামুক, মৃত স্কুইড, ছোট প্রজাতির তারামাছ ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের জীবনকাল তিন থেকে পাঁচ বছর।

লিখেছেনঃ আরিফুর রহমান।

পরিবেশবান্ধব প্রাণী গুইসাপ

গুইসাপ এক ধরনের টিকটিকি। এদের জিহ্বা মসৃণ, লম্বা, সরু, অগ্রভাগ দ্বিখণ্ডিত, লিকলিকে এবং সাপের জিহ্বার মতো সংকোচনশীল। দাঁতগুলো পোরোডন এবং পেছনে বাঁকানো। মুখ বন্ধ থাকলেও ঠোঁটের আগায় ফাঁক থাকায় তার ভেতর দিয়ে জিহ্বা চলাচল করতে পারে। সারা শরীর দানাদার বা গোলাকৃতির আবৃত থাকে। কালো গুইসাপ ৫ ফুটের মতো লম্বা হয়ে থাকে।

সোনা গুইসাপ কালো গুইসাপের চেয়ে ছোট আকৃতির হয়। রামগদি গুইসাপ বিশাল আকৃতির হয়ে থাকে। একটি  পূর্ণ বয়স্ক রামগদি গুইসাপ সর্বোচ্চ ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। কালো গুইসাপ লোকালয়ে বসতবাড়ির আশপাশে বাস করে। তবে সোনা গুইসাপের স্বভাব কালো গুইসাপের সম্পূর্ণ বিপরীত। এরা লোকালয় থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। এদের বেশি দেখা যায় হাওর-বিলের কাছাকাছি জায়গায়।

এরা দক্ষ সাঁতারু হয়ে থাকে। আর রামগদি গুইসাপ সম্পূর্ণ লোনা পানির বাসিন্দা। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে এদের বসবাস। এরা গাছে চড়তে বেশ পটু। গুইসাপের খাদ্য হচ্ছে ছোট সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, কেঁচো, ছোট মাছ, কাঁকড়া, শামুক, কচ্ছপ, হাঁস-মুরগির ডিম ইত্যাদি। সুযোগ পেলে হাঁস-মুরগিও এরা শিকার করে। এছাড়া জীবজন্তুর মৃতদেহও এরা সাবাড় করে। গুইসাপ কুমিরের মতো ছোট বাচ্চার পরিচর্যা করে না।

তাই বাচ্চাগুলোর অধিকাংশই নানা প্রাণীর পেটে চলে যায়। খাদ্য শৃঙ্খলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গুইসাপ পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। এই প্রাণীটি নিঃসন্দেহে পরিবেশবান্ধব উপকারী জীব। বন ধ্বংস, খাদ্যাভাব, পরিবেশ দূষণ, অতিরিক্ত কৃষি কাজ, নগর সভ্যতার দ্রুত সম্প্রসারণ ইত্যাদি নানা কারণে এই উপকারী পরিবেশবান্ধব প্রাণীটি এখন হুমকির মুখে।

পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলেই গুইসাপ দেখা যায়। আর বাংলাদেশসহ গোটা ভারত উপমহাদেশ হচ্ছে গুইসাপের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশে যে ১২৬ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে তাদের মধ্যে, গুইসাপ হচ্ছে লেসারটেলিয়া উপবর্গের ভ্যারিনিডাই গোত্রের সরীসৃপ। পৃথিবীতে মেরুদণ্ডি প্রাণী হিসেবে প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল শীতল রক্তবিশিষ্ট এই সরীসৃপরা, যারা স্থলভাগে অভিযোজিত হয়ে বসবাস শুরু করে।

এক সময় বাংলাদেশের সর্বত্র বিপুলসংখ্যায় গুইসাপ দেখা যেত। এখনো কম-বেশি এদের দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে ৩ প্রজাতির গুইসাপ দেশের সব এলাকায় কোনোমতে টিকে আছে। এগুলো হলো, কালো গুইসাপ, সোনা গুইসাপ এবং রামগদি গুইসাপ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) কালো গুইসাপকে সংকটাপন্ন এবং সোনা গুইসাপ ও রামগদি গুইসাপকে বিপন্নের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

লিখেছেনঃ আজিজুর রহমান

ভয়ঙ্কর এক রাক্ষুসে মাছ

আফ্রিকাতে কঙ্গোর নদীগুলোতে প্রায়ই দুই মিটার দৈর্ঘ্যর এবং পঞ্চাশ কেজি ওজনের টাইগারফিশ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। জেলেরা মাঝে মাঝেই লক্ষ্য করেন এই মাছেরা শিকার করার জন্য তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কোন কুমিরকে।

এই মাছটিকে পিরানহা মাছেদের মতো ভয়ঙ্কর বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন হাইড্রোসাইনাস গলাইয়াথ Hydrocynus goliath এবং এদের ইংরেজি নাম Tigerfish আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন মাছটি আফ্রিকানদের কাছে কিংবদন্তিতুল্য। এদের দাঁতগুলো ধারালো চাকুর মতো।

মিঠাপানিতে বাস করা অন্য মাছের জন্য এটি ভয়ঙ্কর তো বটেই, বিজ্ঞানীরা বলছেন মানুষের জন্যও ভয়ঙ্কর। একবার এরা কাছাকাছি কোন মানুষে পেলে আর রক্ষা নেই।পৃথিবীতে মাছের রয়েছে অসংখ্য প্রজাতি। নানা প্রজাতির মাছের মধ্যে নোনাপানির তুলনায় মিঠাপানিতে বাস করা মাছগুলো হয় অপেক্ষাকৃত বেশি নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির।

কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশের কঙ্গোর নদীগুলোতে বাস করা টাইগারফিশ নামের বিশালাকৃতির এই মাছ দেখলে যে কারো মিঠাপানির মাছ সম্পর্কে ধারণা বদলে যাবে। কারণ মাছটি নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির তো নয়ই, দাঁতগুলো দেখলে সমুদ্রে বাস করা হাঙরের মতো ভয়ঙ্কর বলেই মনে হবে। আরো মনে হবে এমন প্রাণী চলচ্চিত্র বা প্রাচীন লোককথায় উল্লেখিত দৈত্য ছাড়া আর কিছু নয়।

দৈত্যের মতো দেখতে মাছটির বিচরণক্ষেত্র দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত। এই টাইগারফিশের রয়েছে বত্রিশটি ধারালো দাঁত। এগুলোর মধ্যে সামনের দুই পাটির দাঁত ভীষণ বড়।

লিখেছেনঃ শিমুল শাহরিয়ার।

চিত্রিত আঁচিলা গেছো ব্যাঙ

প্রাণীটি বিরল প্রজাতির ক্ষুদ্রাকৃতির ব্যাঙ। নাম চিত্রিত আঁচিল ব্যাঙ বা শৈবাল আঁচিল ব্যাঙ খুবই বিরল প্রজাতির এই ব্যাঙের ইংরেজি নাম Pied warty frog এবং বৈজ্ঞানিক নাম Theloderma Asperum এই প্রজাতির ব্যাঙ দৈর্ঘ্যে মাত্র ১৬ মিলিমিটার পর্যন্ত থাকে। এরা আকারে আমাদের বুড়ো আঙুলের নখের সমান প্রায়।

বাংলাদেশের দুই প্রাণী গবেষক ২০০৭ সালে এই প্রজাতির ব্যাঙের নামকরণ করেন চিত্রিত আঁচিলা গেছো ব্যাঙ। আইইউসিএনের তথ্যানুসারে অবশ্য চিত্রিত আঁচিল ব্যাঙ বিপন্ন তালিকাভুক্ত নয়। তবে নানাভাবে পরিবেশ দূষণের কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। এরা দিনের আলোতে লুকিয়ে থাকে। রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে শুধুই ছোট ছোট পোকা-মাকড।

যত প্রজাতির ব্যাঙ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যায তার মধ্যে এই চিত্রিত আঁচিল ব্যাঙ সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্রাকৃতি ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের মেঘালয়  অরুণাচল প্রদেশের পাহাড়-অরণ্যে এদের দেখা মেলে। পানি দূষণ, চাষাবাদের জন্য ভূমির ব্যবহার, নগরায়ণ, ভূমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সর্বোপরি প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতা যে হারে বাড়ছে তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, অদূর ভবিষ্যতে এই প্রাণীটির অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে।

এদের শরীরজুড়ে রয়েছে সাদা ও কালো রঙের বাহার। চোখের অংশ খানিকটা লাল। বন্য প্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রী তানিয়া খান বাংলাদেশে প্রথম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে এই ব্যাঙের সন্ধান পান। গাছের পাতার উপরে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন পাখির বিষ্ঠা। চোখ এড়িয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি জিনিস পড়ে আছে বাস্তবে এটি ক্ষুদ্র মেরুদণ্ডী প্রাণী হচ্ছে এরা। বরাবরই ওরা অদেখা বস্তুর মতো নীরবে মিশে থাকে প্রকৃতিতে। ক্ষুদ্রতম বলে স্বাভাবিকভাবে নজরেও আসে না। অণুবীক্ষণের চোখ নিয়ে খুঁজতে গেলেই ধরা পড়ে উপস্থিতিটা। তাও সব সময় না, কখনো-সখনো দেখা মেলে এদের।

লিখেছেনঃ বিশ্বজিৎ ভটাচার্য

 

আজব পাখি এমু

এমু পাখিরা সাধারণত একা একা থাকতে বেশি পছন্দ করে। তবে নতুন কোনো জায়গায় খাবারের খোঁজে যাওয়ার সময় ঝাঁক বেঁধে চলে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় এমুরা একটি বিশেষ ভঙ্গিতে চলাফেরা করে। গ্রীষ্মকালে ওরা উত্তরমুখী এবং শীতকালে দক্ষিণমুখী হয়ে চলাফেরা করে। প্রয়োজনে ওরা সাঁতরে জলাভূমিও পার হতে পারে। এরা ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জোড়া বেঁধে চলাফেরা করে। বাবা এমু গাছের বাকল, ঘাস-লতাপাতা, গাছের পাতা ও খড়কুটো দিয়ে মাটির ওপর বাসা বানায়। কয়েক দিন পর মা এমু বাসায় ১১ থেকে ২০টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো বড় আকারের, পুরু খোসাযুক্ত এবং দেখতে ঘন সবুজ রঙের।

এক-একটি ডিম ওজনে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম হতে পারে যা আকার ও ওজনের দিক দিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ টি মুরগির ডিমের সমান। মা এমুর ডিম পাড়া শেষ হলে বাবা এমু সেগুলোকে তা দিতে শুরু করে। এ সময় সে কোনো খাবার খায় না, পানিও পান করে না দৈনিক প্রায় ১০ বার বাবা এমু ডিমগুলোকে তা দেয়ার সুবিধার্থে সামান্য উল্টিয়ে দেয় এভাবে প্রায় ৮ সপ্তাহ তা দেয়ার পর বাবা এমু নিজের দেহের এক-তৃতীয়াংশ ওজন হারায়। এ সময় তার দেহের সঞ্চিত চর্বি দেহে পুষ্টি জোগায় এবং বাসার ডালপালাতে রাতে ঝরে পড়া শিশিরবিন্দু থেকে তৃষ্ণা মেটা। প্রায় ৫৬ দিন তা দেয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

ডিম ফুটে বের হওয়া ছানারা জন্মের পরপরই ছোটাছুটি শুরু করে। কয়েক দিন পর ওরা বাসা ছেড়ে বাইরে বের হয়। বাচ্চাদের দেড় বছর পর্যন্ত বাবা এমু দেখাশোনা করে। এ সময় সে সবাইকে আত্মরক্ষা করতে এবং নিজের খাবার খুঁজে খেতে শেখায়। বাচ্চা এমু খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠে। বড় হওয়ার পরও প্রায় ৬ মাস পরিবারের সাথে থাকে। তারপর স্বাধীনভাবে থাকার জন্য দল থেকে বের হয়ে যায়। এমুরা প্রায় ১০ থেকে ২০ বছর বাঁচে। এমুর পায়ের তিনটি আঙুল তিন দিকে ছড়ানো থাকে। উটপাখি এমুর মতো দ্রুতবেগে দৌড়াতে পারলেও ওদের পায়ে মাত্র দু’টি আঙুল রয়েছে।

পৃথিবীতে উড়তে পারে না এমন পাখিদের মধ্যে এমু একটি। এরা হলো অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখি। আর যদি পৃথিবীর কথা ধরা হয় তাহলে ওরা হলো তৃতীয় বৃহত্তম পাখি। এক-একটা এমুর উচ্চতা কত প্রায় ৬ ফুট পা লম্বা হওয়ায় অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে পারে চোখের পলকে।  প্রয়োজন হলে খুব জোরে দৌড়াতেও পারে দৌড়ের গতি কিন্তু একেবারে খারাপ না, ঘন্টায় ৩০ মাইল। এরা এক জায়গায় খুব বেশি দিন বাস করে না। কারণ খাবারের খোঁজে প্রায়ই দূর থেকে দূরে ঘুরে বেড়াতে হয়। বিভিন্ন ধরনের লতা-গুল্ম ও পোকামাকড়ই এদের প্রধান খাবার। এরা কখন কী ধরনের খাবার খাবে তা অবশ্য গাছপালার সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। গাছপালার পাশাপাশি ওরা ঘাসফড়িং, ঝিঁঝিঁ পোকা, লেডিবার্র্ড বিটল ইত্যাদি খায়। অস্ট্রেলিয়ায় এমুর গোশত, তেল ও চামড়ার প্রচুর চাহিদা।

এ জন্য এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এমুর খামার করে অনেকেই। এমুর পালক অগোছাল, বাদামি কিংবা ধূসরাভ বাদামি। পালকের ভিত্তিমূল ও অগ্রভাগ কালো। পালকের অগ্রভাগে সূর্যের আলো শোষিত হয়  আর ভেতরের দিকের আলগা পালকগুলো চামড়ার অন্তরক হিসেবে কাজ করে। প্রচণ্ড গরমের দিনে এমুরা দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য জোরে জোরে শ্বাস নেয়। তখন তাদের ফুসফুস এয়ারকুলারের মতো করে কাজ করে। ঠাণ্ডা আবহাওয়াময় দিনে এমুরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেয়। ওদের নাকের ভেতরে বড়, বহু ভাঁজবিশিষ্ট প্রকোষ্ঠ রয়েছে ঠাণ্ডা বাতাস নাকের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে গরম হওয়ার পর ফুসফুসে যায়। নি:শ্বাস ছাড়ার সময় নাকের ঠাণ্ডা প্রকোষ্ঠ জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাসকে ঘনীভূত করে বাতাসে ছেড়ে দেয় এবং পরে আবার নতুন বাতাস গ্রহণ করে।

পুরুষ এমুর ঘাড়ের দিকটা নীল রঙের আর মেয়ে এমুর ঘাড়ের দিকটা ধূসর-বাদামি রঙের। এমুর ডাক বেশ কর্কশ, আবার কখনো বা ঢাকের আওয়াজের মতো। এদের ডাক প্রায় ২ কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যা গলায় থাকা বিশেষ ধরনের স্বরথলির মাধ্যমে। ওরা এমন অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি করে।

লিখেছেনঃ শাহরিয়ার শিমুল।

বাঘবাল্লা প্রজাপতি

অনেকের কাছে  এরা বাঘ বা বাঘবাল্লা নামেও পরিচিত। একে রাজকীয় প্রজাপতি হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই এরা রাজা বা (Monarch) নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে এদের বলে Striped Tiger/Common Tiger/Indian Monarc এরা হচ্ছে Danaidae (ডানাইডি) পরিবারে সদস্য এই ডোরাকাটা বাঘের বৈজ্ঞানিক নাম Danaus genutia genutia. এরা পরিযায়ী স্বভাবের প্রজাপতি। সব অঞ্চলেই বাস করতে সক্ষম। তবে অতি বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকায় বেশি দেখা যায়। সারা বছরই ঝোপ-জঙ্গল ও বাগানে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়।

সমুদ্রপৃষ্ঠের দুই হাজার ৫০০ মিটার উঁচুতেও দেখা মেলে। এরা ধীরগতির প্রজাপতি। তবে পরিযায়ী স্বভাবেরগুলো দ্রুতগতিতেও উড়তে পারে। হেমন্তে এরা সহজেই কানাডা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত পথও পাড়ি দিতে পারে। স্ত্রী প্রজাপতি নির্দিষ্ট গাছের পাতার নিচের প্রান্তে ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা হালকা হলদে হয়ে যায়। ডিম ফুটে শূককীট বের হতে মাত্র চার দিন লাগে। শূককীট বের হয়ে প্রথমেই ডিমের খোসাটি খেয়ে ফেলে।

এর পর থেকে পাতা খেয়েই বড় হয়। শূককীটের দেহে হলুদ, কালো ও সাদা ডোরা থাকে। মাথায় থাকে হলুদ ও কালো ডোরা। এগুলো ৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। শূককীট দুই সপ্তাহ পর মুককীটে পরিণত হয়। আর মুককীট অবস্থায় দুই সপ্তাহ থাকার পর একদিন সকালে খোলস কেটে পূর্ণবয়স্ক ডোরাকাটা বাঘ বের হয়ে আসে। এরা দুই থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও পুরো এশিয়া, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এবং ক্যানারি দ্বীপে এদের দেখা মেলে।

প্রসারিত অবস্থায় এদের ডানার মাপ স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ৭ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক শূন্য সেন্টিমিটার হয়। সাধারণত পুরুষটি স্ত্রীর চেয়ে কিছুটা বড়। সামনের ডানার ওপরের কোষগুলো গাঢ় কমলা-বাদামী পেছনের ডানারগুলো হালকা কমলা-বাদামি। ডানার কালো ও স্পষ্ট শিরাগুলোই ডোরাকাটা দাগের সৃষ্টি করে। নিচে তিনটি কমলা ও কতগুলো সাদা দাগ রয়েছে। এ ছাড়া পুরো ডানার প্রান্তজুড়ে রয়েছে কালো ডোর, যার ওপর দুই সারি সাদা ফোঁটা। কালোর ওপর সাদা ফোঁটার এই কারুকাজ প্রজাপতিটির মাথা, বুক ও পেটেও দেখা যায়। দেহের নিচের অংশের রং ও কারুকাজ ওপরের অংশের মতোই, তবে হালকা।

পেছনের ডানার নিচের দিকে সাদা-কালো ফোঁটা দেখে পুরুষ প্রজাপতি চেনা যায়। দেহ ও ডানার উজ্জ্বল কমলা ও কালো রং কিন্তু বেশ বিষাক্ত। এই রং দেখেই শত্রুরা এদের ধারেকাছে ঘেঁষতেও সাহস পায় না।

লিখেছেনঃ শেখ সাদী।

বিরল প্রজাতির পাখি তুলিকা

দেখতে চড়ুই পাখির মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এরা চড়ুই পাখি নয়। এরা আমাদের দেশের স্থায়ী বাসিন্দা নয় পরিযায়ী পাখি প্রচণ্ড শীতে ইউরেশিয়া থেকে পরিযায়ী হয়ে এরা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চলে আসে। শীত মৌসুমে দেশের সর্বত্রই এদের বিচরণ হলেও সংখ্যায় সন্তোষজনক নয়। মাঝে মধ্যে এদেরকে ঢাকা শহরেও দেখা যায়।

বিশেষ করে মিরপুরের উদ্ভিদ উদ্যানে মাঝে মাঝে নজরে পড়ে। হালকা বনাঞ্চল এলাকা এদের প্রিয়। আম-বাঁশ বাগানে বেশি নজরে পড়ে। জলপানের তৃষ্টা না পেলে জলাশয়ের ধারে-কাছে পারতপক্ষে ভিড়ে না। এরা ভীতু প্রকৃতির পাখি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যের সন্ধানে মাটিতে নামে। এমতাবস্থায় ভয় পেলে অল্প আওয়াজ করে উড়ে যায়। ভয় কেটে গেলে পুনরায় মাটিতে নেমে খাবার খায়।

এ পাখি ছোট-বড় দলে আলো-আঁধারি ভূমির ওপর পোকামাকড় খোঁজে। বিশেষ করে মাঠে-ময়দানে দৌড়ে দৌড়ে শিকার ধরে। খঞ্জন পাখির মতো এরাও লেজ নাচায়। সারাক্ষণ নয়, মাঝে মধ্যে নাচায়। পাখিটাকে দেখে প্রথমত খঞ্জন প্রজাতির পাখি মনে হতে পারে। পাখিটার বাংলা নাম হচ্ছেচ তুলিকা, এদেরকে ইংরেজিতে ডাকা হয় অলিভ ব্যাকেড পিপিট  olive backed pipit, এবং এদের বৈজ্ঞানিক নাম Anthus hodgsoni লম্বায় এরা সাধারণত ১৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। এদের শুধু লেজটায় ৬ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

এদের গলার পাশে কালো ডোরা থাকে, এদের ঠোঁট ছোট হয়। দেহের অধিকাংশ পালক সবুজাভ-জলপাই। তার ওপর চওড়া, খাটো ডোরা দাগ থাকে। এদের ডানায় স্পষ্ট সাদা বন্ধনী আছে। তলপেটের দিকে কোনো ধরনের রেখা নেই। লেজের তলার দিকটা সাদাটে, আবার লেজের দু’পাশের পালকও সাদাটে। চোখের বলয় সবুজাভ-জলপাই, ভ্রুর ওপরে সাদা ডোরা আছে। পা হলুদাভ-বাদামি, স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম।

তুলিকা পাখির প্রধান খাবার পোকামাকড়, ঘাসবীজ ইত্যাদি। প্রজনন সময় মে থেকে জুলাই মাস। এসময় এরা বাসা বানায় সরু-নরম লতা দিয়ে। ডিমের সংখ্যা ৩ থেকে ৫টি, ডিম ফুটতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৩ দিন।

 

লিখেছেনঃ আলম শাইন

লেখক : কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী গবেষক ও পরিবেশবাদী লেখক।

মহাবিপন্ন পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ

এই হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ বাংলাদেশে তো বটেই, পৃথিবীজুড়েও এরা মহাবিপন্ন তালিকাভুক্ত একটি প্রাণী। আই ইউ সি এন এদের লাল তালিকাভুক্ত প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ যারা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ খুবই বিরল প্রজাতির প্রাণী। এদের শরীরজুড়ে হলুদ রঙের মধ্যে কালো কালো ছাপ রয়েছে। এরা ঘন বন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ঝোপঝাড় ও ছড়ার আশপাশে থাকে। এরা সাধারণত একাই বিচরণ করে। প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ও পুরুষ একত্রে থাকে।

প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ও স্ত্রী হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের মাথা এবং মুখের আশপাশে লালচে রং ফুটে ওঠে। মে থেকে অক্টোরর এদের প্রজননকাল। এরা সাধারণত বর্ষা মৌসুমে দুই থেকে ৯টি ডিম পাড়ে। এরা মুরগির মতো ডিমে তা দেয় না। মাটিতে গর্ত করে ডিমগুলো ঢেকে রেখে চলে আসে। তিন থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পর ছানা বের হয়। বাচ্চাগুলো পাঁচ থেকে সাত সেন্টিমিটার হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল এবং  দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এদের পাওয়া যায়। হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের ইংরেজি নাম Elongated tortoise এবং বৈজ্ঞানিক নাম Imdptestido elongata।

এরা মূলত ডাঙ্গার কচ্ছপ। অন্য যেসব কচ্ছপ আমরা পানিতে দেখি তারা ডাঙ্গায় বেশি সময় থাকে না। কিন্তু এ কচ্ছপটি ডাঙাতেই বেশি সময় থাকে। এর ফলে এ প্রাণীটি খুব সহজেই মানুষের নজরে আসে। পানির কচ্ছপগুলো তো সব সময় দেখা যায় না। ডাঙায় থাকে বলেই এটিকে মানুষ প্রায়ই মাংসের জন্য হত্যা করে। আর এভাবেই এদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।  বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র চিরসবুজ বনেই এদের বসবাস। এরা আকারে ৩৩ সেন্টিমিটার এবং ওজনে প্রায় তিন কেজি হয়ে থাকে।

এরা মূলত নিরামিষভোজী, বিভিন্ন পাতা, সবুজ কচি ঘাস, ফুল, ফল ও ব্যাঙের ছাতা অর্থাৎ ফাঙ্গাস খায়। এই হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ আজ পৃথিবী থেকে বিলুপ্তির পথে। আমাদের একটু সচেতনতাই পারে এই প্রাণীটিকে রক্ষা করতে।

লিখেছেনঃ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

সবুজ অজগর

সবুজ গেছো অজগর বা (Emerald Tree Boa) এটি  একটি বিষহীন সাপ। এদেরকে মূলত দক্ষিণ আমেরিকার রেইন ফরেস্টে দেখতে পাওয়া যায়। গায়ের রঙ সম্পুর্ণ গাড়ো সবুজ, তাছাড়া এরা থাকেও গাছে গাছে। এজন্যই এর নাম হয়েছে সবুজ গেছো অজগর।

প্রাপ্তবয়স্ক হলে এরা প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এদের সামনে যে দাঁত দুটো আছে সেগুলো অন্য যে কোনো বিষহীন সাপের চেয়ে বড়। সাপ দেখে ভয় পায় না এমন মানুষ খুবই কম। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু সাপ রয়েছে যাদের একবার দেখলে চোখ ফেরানোই দায়।

চোখ ধাঁধানো গায়ের রং এদের দিয়েছে চমৎকার সৌন্দর্য। এই সবুজ গেছো অজগর বা Emerald Tree Boa-কে অনেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং রংচঙে সাপ বলে থাকে। বিভিন্ন দেশের সৌখিন প্রাণী পালকদের মধ্যে এই সবুজ গেছো অজগরের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

সবাই আসলে চাই এরকম একটি সাপ নিজের বাড়িতে একুরিয়ামে রেখে পালতে। কিন্তু এরা তাদের এই সৌন্দর্যের কারণে যে মহা মুল্যবান। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাপ্ত বয়স্ক একটি Emerald Tree Boa সাপের বাজার মুল্য রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলার। যে কারণে অনেকেই এদের পালন করে বানিজ্যিকভাবে লাভবানও হয়ে থাকেন।

লিখেছেনঃ রবিউল আলম।

পাঁচডোরা কাঠবিড়ালি

কাঠবিড়ালী কাঠবিড়ালী পেয়ারা তুমি খাও ? বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা খুকি ও কাঠবিড়ালী কবিতা পড়েননি এমন কাওকে খুজে পাওয়া ভার। খুব পরিচিত অনিন্দ্য সুন্দর দূরন্ত এই প্রাণীটি এখন আর আগের মতো খুব একটা দেখা যায় না। কাঠবিড়ালী (Squirrel)  Rodentia বর্গের Sciuridae গোত্রের প্রধানত বৃক্ষবাসী  স্তন্যপায়ী প্রাণী।

এদের শরীর লম্বাটে, লেজ লম্বা ও ঝোপালো। কাঠবিড়ালী বহুদৃষ্ট স্তন্যপায়ীর মধ্যে অন্যতম। অস্ট্রেলিয়া ও কুমেরু ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্র এদের দেখা যায়।  প্রায় শরীরের সমান দীর্ঘ লেজ, পুরো লেজ ঘন পশমে ঢাকা। বড় বড় চোখ, প্রখর দৃষ্টি, সামনের দুই পা ছোট। পায়ের আঙুলে ধারালো নখ রয়েছে।

এই নখ দিয়ে এরা তরতরিয়ে লম্বা যেকোনো গাছে উঠতে পারে। পেছনের লম্বা পা কাজে লাগায় দ্রুতগতিতে লাফ দিতে পারে। লম্বা গাছে ওঠার সময় বুদ্ধি করে লেজ গুটিয়ে রাখে। আমাদের দেশে এর আটটি প্রজাতি দেখা যায়। এর মধ্যে পাঁচডোরা কাঠবিড়ালি দেখতে সবচেয়ে সুন্দর।

বাদামি, কালো, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতে দেখা যেতো কিন্তু বর্তমানে তাদের খুজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে অল্প কিছু পাঁচডোরা কাঠবিড়ালির দেখা মেলে। আকারে ছোট, লেজসহ মোট দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি। একটা সময় বনে জঙ্গলে গাছপালায় এমনকি লোকালয়ে কাঠবিড়ালীর অবাধ বিচরণ থাকলেও বর্তমানে অসাধু চোরা শিকারিদের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে নয়নাভিরাম ছোট্ট এই প্রাণী কাঠবিড়ালির ওপর।

ডোরাকাটা এই কাঠবিড়ালি শিকারিরা ধরে পাচার করছে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োগ সর্বপোরি আবাসভূমি বিনষ্টের কারণে দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে কাঠবিড়ালী। বাদামি রঙের ওপর কালো ডোরার এই কাঠবিড়ালির প্রিয় খাবার ফল, খেজুরের রস, বীজ।

এরা একসঙ্গে একাধিক বাচ্চা দেয়। নিরীহ প্রাণীটির চলাফেরা বা খাবার সংগ্রহের দৃশ্যও যেকোনো সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করবে। যদি অতি দ্রুত সুন্দর এই প্রাণীটি টিকিয়ে রাখার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করা না যায় তাহলে একদিন সম্পুর্ণরুপে এদেরকে আমাদের দেশ থেকে হারাতে হবে।

লিখেছেনঃ মোঃ উজ্জ্বল